বন্ধুরা, কেমন আছেন সবাই? আমাদের স্বাস্থ্যই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ, আর সুস্থ থাকতে হলে মাঝে মাঝে কিছু শারীরিক পরীক্ষা তো করাতেই হয়। কিন্তু সেই ল্যাব রিপোর্টগুলো হাতে এলে কি আমরা সব বুঝতে পারি?

জটিল মেডিকেল টার্ম আর সংখ্যা দেখে অনেকেই হয়তো ঘাবড়ে যান, তাই না? আমার নিজের অভিজ্ঞতাও ঠিক এমনই ছিল! একজন ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া সহজ ব্যাখ্যা এবং আমার দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে আজ আমি আপনাদের সাথে ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি ল্যাব রিপোর্ট কেসগুলোকে কিভাবে একদম সহজভাবে বোঝা যায়, সেই বিষয়ে কিছু অসাধারণ টিপস আর গাইডলাইন শেয়ার করব। চলুন, আর দেরি না করে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই!
ল্যাব রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর প্রথম ধাপ: শান্ত থাকুন এবং মনোযোগ দিন
ল্যাব রিপোর্ট হাতে আসা মানেই যে সব শেষ, এমনটা কিন্তু নয়। বরং, আমি নিজে দেখেছি, অনেকেই রিপোর্ট হাতে পেয়েই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, যা আসলে আরও বেশি মানসিক চাপ তৈরি করে। প্রথমেই মনে রাখবেন, একটি রিপোর্ট মানে কেবল কিছু তথ্য, আর এই তথ্যগুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারলেই আপনি নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবেন। আমার এক বন্ধু, যার রিপোর্ট দেখে সে প্রায় নির্ঘুম রাত কাটিয়েছিল, পরে দেখা গেল তেমন গুরুতর কিছুই ছিল না, শুধু কিছু মান সামান্য এদিক-ওদিক হয়েছিল। তাই, আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে রিপোর্টটি হাতে নিন এবং মনোযোগ দিয়ে দেখার চেষ্টা করুন। এতে মানসিক চাপ কমবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।
সাধারণ ভুল ধারণা দূর করুন
অনেক সময় আমরা ইন্টারনেটে অল্প কিছু তথ্য দেখে নিজেদের চিকিৎসা শুরু করে দেই, যা খুবই বিপজ্জনক। একটি রিপোর্টে অসংখ্য প্যারামিটার থাকে, যার প্রত্যেকটির নির্দিষ্ট কাজ এবং স্বাভাবিক মাত্রা আছে। এই মাত্রাগুলো ল্যাব ভেদে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে, তাই আপনার রিপোর্টে উল্লেখিত ‘রেফারেন্স রেঞ্জ’ (Normal Range) এর দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। মনে রাখবেন, রেফারেন্স রেঞ্জের বাইরে গেলেই যে আপনি অসুস্থ, এমনটা নয়। অনেক সময় বয়স, লিঙ্গ, জীবনযাপন এমনকি সামান্য জ্বর-সর্দিও কিছু মান পরিবর্তন করে দিতে পারে। তাই, নিজে ডাক্তার সাজার চেষ্টা না করে একজন প্রকৃত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। আমার অভিজ্ঞতা বলে, গুগল থেকে পাওয়া অর্ধেক জ্ঞান অনেক সময় আসল সমস্যার চেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে।
রিপোর্টের মূল অংশগুলো চিনুন
একটি ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি রিপোর্টে সাধারণত রোগীর তথ্য, পরীক্ষার নাম, পরীক্ষার ফলাফল, স্বাভাবিক পরিসীমা (Normal Range) এবং কখনও কখনও কিছু মন্তব্য (Remarks) দেওয়া থাকে। প্রথমেই রোগীর নাম, বয়স, লিঙ্গ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য মিলিয়ে নিন। এরপর একে একে পরীক্ষার নাম এবং ফলাফলগুলো দেখুন। স্বাভাবিক পরিসীমা প্রতিটি পরীক্ষার পাশে উল্লেখ করা থাকে, যার সাথে আপনার ফলাফল তুলনা করে একটি প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন। তবে চূড়ান্ত ব্যাখ্যার জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। আমি দেখেছি, অনেকে রেফারেন্স রেঞ্জ না দেখেই কেবল ফলাফলের সংখ্যা দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তাই, প্রতিটি অংশের গুরুত্ব বোঝা খুব জরুরি।
রক্তের সাধারণ পরীক্ষা (CBC) বোঝা: একটি সম্পূর্ণ গাইড
কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট, যা আমরা সচরাচর সিবিসি (CBC) নামেই চিনি, এটি সবচেয়ে মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ রক্ত পরীক্ষাগুলোর মধ্যে একটি। এই পরীক্ষা আপনার রক্তের বিভিন্ন কোষ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়, যা শরীরের সাধারণ স্বাস্থ্য অবস্থা, সংক্রমণ, রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া এবং প্রদাহ (Inflammation) সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। যখন আমি প্রথমবার আমার সিবিসি রিপোর্ট হাতে পেয়েছিলাম, সংখ্যাগুলো দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার চিকিৎসক বন্ধু বুঝিয়ে বলার পর দেখলাম, বিষয়গুলো আসলে অতটাও জটিল নয়। এই পরীক্ষাটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, যেকোনো সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা অসুস্থতার প্রাথমিক নির্ণয়ে এটি ব্যবহার করা হয়। এটি অনেকটা শরীরের অভ্যন্তরীণ অবস্থার একটি স্ন্যাপশটের মতো, যা আপনার ডাক্তারকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে।
শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) এবং এর প্রকারভেদ
শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cells – WBC) আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। এর কাজ হলো বাইরের ক্ষতিকারক জীবাণু, যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াই করা। রিপোর্টে WBC-এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে সাধারণত কোনো ধরনের সংক্রমণ বা প্রদাহের ইঙ্গিত দেয়। আবার, যদি WBC-এর মাত্রা কম হয়, তাহলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেছে বা অস্থিমজ্জার কোনো সমস্যা হয়েছে এমনটা বোঝাতে পারে। WBC-এর আবার কয়েকটি প্রকারভেদ আছে, যেমন নিউট্রোফিল (Neutrophils), লিম্ফোসাইট (Lymphocytes), ইওসিনোফিল (Eosinophils), মনোসাইট (Monocytes) এবং বেসোফিল (Basophils)। প্রতিটি কোষের নিজস্ব কাজ আছে এবং তাদের অনুপাত দেখে ডাক্তাররা সংক্রমণের ধরণ সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট ধারণা পান। আমার মনে আছে, একবার আমার ফ্লু হয়েছিল, তখন আমার নিউট্রোফিলের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল, যা ভাইরাল সংক্রমণের একটি সাধারণ লক্ষণ।
লোহিত রক্তকণিকা (RBC) ও হিমোগ্লোবিন (Hb)
লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Cells – RBC) আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার জন্য অপরিহার্য। হিমোগ্লোবিন (Hemoglobin – Hb) হলো এই লোহিত রক্তকণিকার ভেতরে থাকা প্রোটিন, যা অক্সিজেন বহন করে। যদি আপনার রিপোর্টে RBC বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে, তাহলে এটি অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতার লক্ষণ হতে পারে। অ্যানিমিয়া হলে শরীর দুর্বল লাগে, অল্পতেই ক্লান্তি আসে এবং শ্বাসকষ্টও হতে পারে। অন্যদিকে, RBC বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বেশি হলে তা ডিহাইড্রেশন বা ফুসফুস-সংক্রান্ত কোনো সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। আমি নিজে দেখেছি, পর্যাপ্ত আয়রন বা ভিটামিন বি১২ গ্রহণ না করলে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যায়। তাই, পুষ্টিকর খাবার খাওয়াটা খুব জরুরি। এই প্যারামিটারগুলো দেখে আপনার ডাক্তার বুঝতে পারবেন, আপনার শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাচ্ছে কিনা এবং রক্ত উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি ঠিকঠাক চলছে কিনা।
লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) এবং কিডনি ফাংশন টেস্ট (KFT) এর গুরুত্ব
আমাদের শরীরের দুটো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো লিভার এবং কিডনি। লিভার আমাদের শরীরের ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়ায় (বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে) সাহায্য করে এবং হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, আর কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ফিল্টার করে শরীরকে সুস্থ রাখে। এই দুই অঙ্গের কার্যকারিতা বোঝার জন্য লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) এবং কিডনি ফাংশন টেস্ট (KFT) করা হয়। আমার এক চাচার লিভারের সমস্যা হয়েছিল, তখন ডাক্তাররা LFT করিয়েই তার অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছিলেন। এই পরীক্ষাগুলো আমাদের শরীরের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দেয়, যা হয়তো অন্য কোনোভাবে জানা সম্ভব নয়। তাই, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় এই পরীক্ষাগুলো থাকা উচিত, বিশেষ করে যদি আপনার কোনো দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে।
লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) এর বিস্তারিত
এলএফটি (LFT) একটি রক্ত পরীক্ষা, যা লিভারের বিভিন্ন এনজাইম এবং প্রোটিনের মাত্রা পরিমাপ করে। এর মাধ্যমে লিভারের প্রদাহ, ক্ষতি বা হেপাটাইটিস, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এবং সিরোসিসের মতো রোগগুলো নির্ণয় করা যায়। এই পরীক্ষায় মূলত ALT (অ্যালানাইন ট্রান্সমিনেজ), AST (অ্যাসপার্টেট ট্রান্সমিনেজ), ALP (অ্যালকালাইন ফসফেটেস), বিলিরুবিন (Bilirubin) এবং অ্যালবুমিনের (Albumin) মাত্রা দেখা হয়। ALT এবং AST এর উচ্চ মাত্রা লিভারের ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়। ALP এর উচ্চ মাত্রা পিত্তনালীর বাধা বা হাড়ের সমস্যা বোঝাতে পারে। বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস হতে পারে, যা লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার একটি স্পষ্ট লক্ষণ। অ্যালবুমিন হলো লিভার দ্বারা উৎপাদিত একটি প্রোটিন, যার কম মাত্রা লিভারের কর্মহীনতা নির্দেশ করে। আমার মনে আছে, একবার অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে আমার লিভার এনজাইমগুলো সামান্য বেড়ে গিয়েছিল, তখন ডাক্তার আমাকে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কিডনি ফাংশন টেস্ট (KFT) এর বিস্তারিত
কিডনি ফাংশন টেস্ট (KFT) মূলত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার একটি সিরিজ, যা কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে। কিডনি আমাদের রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল ফিল্টার করে শরীর থেকে বের করে দেয়। যদি কিডনি ঠিকমতো কাজ না করে, তাহলে এই বর্জ্য পদার্থগুলো শরীরে জমা হয়ে নানা স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। KFT-তে সাধারণত রক্তের ইউরিয়া নাইট্রোজেন (BUN), সিরাম ক্রিয়েটিনিন (Serum Creatinine), এবং গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট (eGFR) এর মতো বিষয়গুলো পরিমাপ করা হয়। ক্রিয়েটিনিন হলো পেশী দ্বারা উৎপন্ন একটি বর্জ্য পদার্থ, যার উচ্চ মাত্রা কিডনির দুর্বল কার্যকারিতা নির্দেশ করে। BUN এর উচ্চ মাত্রাও কিডনির কর্মহীনতার লক্ষণ হতে পারে। eGFR হলো কিডনি প্রতি মিনিটে কতটা রক্ত ফিল্টার করছে তার একটি পরিমাপ, যা কিডনির স্বাস্থ্যের একটি নির্ভরযোগ্য সূচক। যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা আছে, তাদের নিয়মিত KFT করানো উচিত, কারণ এই রোগগুলো কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ডায়াবেটিস পরীক্ষা: রক্তে শর্করার মাত্রা এবং A1C
ডায়াবেটিস আজকাল একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এর গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। এই রোগ আমাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই, নিয়মিত পরীক্ষা করানো এবং শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখাটা খুবই জরুরি। আমার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের ডায়াবেটিস আছে, তাই এই বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনেক গভীর। আমি দেখেছি, সঠিকভাবে পরীক্ষা না করালে বা রিপোর্ট না বুঝলে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা রোগীর জন্য মারাত্মক হতে পারে। ডায়াবেটিস পরীক্ষা শুধু রোগের উপস্থিতি নির্ণয় করে না, বরং এটি রোগ নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফাস্টিং ও পোস্টপ্রান্ডিয়াল ব্লাড সুগার
ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য প্রধানত দুটি রক্ত পরীক্ষা করা হয়: ফাস্টিং ব্লাড সুগার (Fasting Blood Sugar – FBS) এবং পোস্টপ্রান্ডিয়াল ব্লাড সুগার (Postprandial Blood Sugar – PPBS)। ফাস্টিং ব্লাড সুগার পরীক্ষাটি করার জন্য আপনাকে সাধারণত ৮-১০ ঘণ্টা না খেয়ে থাকতে হয়। এই পরীক্ষাটি আপনার খালি পেটে শর্করার মাত্রা কত, তা দেখায়। অন্যদিকে, পোস্টপ্রান্ডিয়াল ব্লাড সুগার পরীক্ষাটি করা হয় খাবার খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর। এই পরীক্ষাটি দেখায় যে আপনার শরীর খাবার খাওয়ার পর শর্করাকে কতটা ভালোভাবে প্রক্রিয়া করতে পারছে। যদি এই দুটি পরীক্ষার ফলাফলই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে আপনার ডায়াবেটিস থাকার সম্ভাবনা থাকে। আমার এক বন্ধুর খালি পেটে সুগার বেশি আসায় তার ডাক্তার আরও বিস্তারিত পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাড়িতে গ্লুকোমিটার দিয়েও অনেকে রক্তে শর্করার মাত্রা মাপেন, যা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য খুব কার্যকর। তবে ল্যাবের পরীক্ষার ফলাফলকে বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হয়।
HbA1c পরীক্ষা: দীর্ঘমেয়াদী শর্করার চিত্র
HbA1c পরীক্ষাটি ডায়াবেটিস নির্ণয় এবং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি গেম-চেঞ্জার। এই পরীক্ষাটি আপনার গত ২-৩ মাসের গড় রক্তে শর্করার মাত্রা নির্দেশ করে। এটি আপনাকে একটি তাৎক্ষণিক চিত্রের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী একটি ধারণা দেয় যে আপনার শর্করা কতটা নিয়ন্ত্রণে আছে। আমেরিকান ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের গাইডলাইন অনুযায়ী, HbA1c-এর মান ৬.৫% এর বেশি হলে ডায়াবেটিস ধরা হয়, এবং ৫.৭% থেকে ৬.৫% এর মধ্যে থাকলে প্রি-ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের পূর্বাবস্থা হিসেবে ধরা হয়। এই পরীক্ষাটির সুবিধা হলো, এর জন্য খালি পেটে থাকার প্রয়োজন হয় না এবং দিনের যেকোনো সময় এটি করানো যায়। আমি নিজে দেখেছি, অনেক রোগী তাদের প্রতিদিনের শর্করার মাত্রা ওঠানামা করলেও HbA1c-এর মান দেখে বুঝতে পারেন যে দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর। এটি ডাক্তারদেরও রোগীর চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে অনেক সাহায্য করে।
কোলেস্টেরল প্রোফাইল: ভালো ও খারাপ কোলেস্টেরলের গল্প
কোলেস্টেরল নামটা শুনলেই অনেকে হয়তো ভয় পেয়ে যান, কিন্তু সব কোলেস্টেরল খারাপ নয়। আমাদের শরীরে ভালো এবং খারাপ দুই ধরনের কোলেস্টেরলই থাকে, যাদের সঠিক ভারসাম্য থাকাটা খুবই জরুরি। কোলেস্টেরল প্রোফাইল পরীক্ষাটা আমাদের রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বোঝার জন্য অপরিহার্য। আমার বাবা একবার তার কোলেস্টেরল রিপোর্ট দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন না যে কোন কোলেস্টেরল ভালো আর কোনটা খারাপ। এই পরীক্ষাটি আমাদের শরীরের ফ্যাট মেটাবলিজম এবং কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করে।
মোট কোলেস্টেরল, LDL, HDL এবং ট্রাইগ্লিসারাইড
একটি সম্পূর্ণ কোলেস্টেরল প্রোফাইল রিপোর্টে সাধারণত চারটি মূল উপাদান পরিমাপ করা হয়: মোট কোলেস্টেরল (Total Cholesterol), লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (LDL – যাকে ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ বলা হয়), হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (HDL – যাকে ‘ভালো কোলেস্টেরল’ বলা হয়) এবং ট্রাইগ্লিসারাইড (Triglycerides)। মোট কোলেস্টেরল হলো রক্তে থাকা সব ধরনের কোলেস্টেরলের সমষ্টি। LDL কোলেস্টেরলকে খারাপ বলা হয় কারণ এটি রক্তনালীর দেওয়ালে জমা হয়ে ব্লক তৈরি করতে পারে, যা হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে, HDL কোলেস্টেরলকে ভালো বলা হয় কারণ এটি রক্তনালী থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল লিভারে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। ট্রাইগ্লিসারাইড হলো রক্তে থাকা এক ধরনের চর্বি, যার উচ্চ মাত্রাও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে এই কোলেস্টেরলগুলোর মাত্রা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন
যদি আপনার কোলেস্টেরল প্রোফাইলের রিপোর্ট অস্বাভাবিক হয়, বিশেষ করে LDL বা ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকে এবং HDL এর মাত্রা কম থাকে, তাহলে আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, কারণ জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, যেমন ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য এবং চর্বিহীন প্রোটিন গ্রহণ করা; স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট এবং চিনি পরিহার করা; নিয়মিত ব্যায়াম করা; ধূমপান ত্যাগ করা এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যন্ত কার্যকর। আমার পরিচিত অনেকেই শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তন এনেই তাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে পেরেছেন। কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তার ওষুধেরও পরামর্শ দিতে পারেন, তবে প্রথম ধাপ হিসেবে জীবনযাত্রার পরিবর্তন অপরিহার্য। নিয়মিত পরীক্ষা করিয়ে আপনার ডাক্তারকে আপনার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত রাখুন, যাতে তিনি সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারেন।
ইউরিনারি বা প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষা (Urine R/M/E) থেকে কী জানবেন?
ক্লিনিক্যাল প্যাথলজির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো ইউরিন রুটিন অ্যান্ড মাইক্রোস্কোপিক এক্সামিনেশন (Urine R/M/E), যাকে আমরা সাধারণত প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষা বা ইউরিন আর/এম/ই টেস্ট বলি। এই পরীক্ষাটি শুধুমাত্র প্রস্রাবের সংক্রমণ নির্ণয়েই নয়, বরং কিডনির স্বাস্থ্য, ডায়াবেটিস এবং লিভারের মতো অন্যান্য অঙ্গের সমস্যা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। আমি যখন প্রথম এই পরীক্ষা সম্পর্কে জানতে পারি, তখন আমার ধারণা ছিল এটি কেবল ইউরিন ইনফেকশন বোঝার জন্য। কিন্তু পরে দেখলাম, এর মাধ্যমে আরও অনেক কিছু জানা যায়। এটি একটি সহজ এবং দ্রুত পরীক্ষা, যা আপনার শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি ভালো ধারণা দিতে পারে।
প্রস্রাবের ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য
ইউরিন R/M/E রিপোর্টে প্রস্রাবের ভৌত (Physical) এবং রাসায়নিক (Chemical) বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা হয়। ভৌত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে প্রস্রাবের রঙ, স্বচ্ছতা (Clarity) এবং গন্ধ। গাঢ় রঙের প্রস্রাব ডিহাইড্রেশন বা লিভারের রোগের ইঙ্গিত দিতে পারে, আর খুব হালকা বা পরিষ্কার প্রস্রাব অতিরিক্ত হাইড্রেশনের লক্ষণ। যদি প্রস্রাব ঘোলাটে দেখায়, তাহলে সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পিএইচ (pH) মাত্রা, গ্লুকোজ, প্রোটিন, কিটোনস, বিলিরুবিন এবং ইউরোবিলিনোজেনের মতো উপাদানগুলো পরিমাপ করা হয়। প্রস্রাবে গ্লুকোজের উপস্থিতি সাধারণত ডায়াবেটিসের লক্ষণ, আর প্রোটিনের উচ্চ মাত্রা কিডনি রোগের ইঙ্গিত দেয়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলে, প্রস্রাবের রঙ বা স্বচ্ছতায় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলে দেরি না করে পরীক্ষা করানো উচিত।
মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষা এবং অস্বাভাবিক কোষ

রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষা। এই ধাপে প্রস্রাবের নমুনাকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পরীক্ষা করে লোহিত রক্তকণিকা (RBC), শ্বেত রক্তকণিকা (WBC), ব্যাকটেরিয়া, ইয়েস্ট, ক্রিস্টাল এবং অন্যান্য অস্বাভাবিক কোষ বা কণা দেখা হয়। প্রস্রাবে লোহিত রক্তকণিকা থাকা আঘাত, সংক্রমণ বা কিডনিতে পাথরের ইঙ্গিত দিতে পারে। শ্বেত রক্তকণিকার উচ্চ মাত্রা সাধারণত মূত্রনালীর সংক্রমণের (UTI) লক্ষণ। ব্যাকটেরিয়া বা ইয়েস্টের উপস্থিতি সরাসরি সংক্রমণের প্রমাণ। এছাড়াও, কিছু ক্রিস্টাল বা অস্বাভাবিক কোষের উপস্থিতি কিডনি বা মূত্রনালীর অন্যান্য সমস্যা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। আমার এক আত্মীয়ের রিপোর্টে প্রচুর WBC এবং ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গিয়েছিল, যা থেকে তার ইউটিআই নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল। সময়মতো এই পরীক্ষা করালে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।
থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (TFT) এবং হরমোনের ভারসাম্য
আমাদের শরীরের প্রতিটি কার্যকারিতায় হরমোনের একটি বিশাল ভূমিকা থাকে, আর থাইরয়েড গ্রন্থি তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন উৎপাদনকারী অঙ্গ। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন আমাদের শরীরের মেটাবলিজম, শক্তি উৎপাদন এবং সামগ্রিক বৃদ্ধি ও বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট (TFT) এই হরমোনগুলোর মাত্রা পরিমাপ করে থাইরয়েডের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে। আমার এক বন্ধুর থাইরয়েডের সমস্যা ছিল, আর সে ঠিকমতো রিপোর্ট না বোঝার কারণে বেশ চিন্তিত ছিল। এই পরীক্ষাগুলো হাইপোথাইরয়েডিজম (কম সক্রিয় থাইরয়েড) এবং হাইপারথাইরয়েডিজম (অতিরিক্ত সক্রিয় থাইরয়েড) এর মতো অবস্থা নির্ণয় করতে সাহায্য করে। থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক প্রভাব ফেলে, তাই এর সম্পর্কে জানা থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।
TSH, T3 এবং T4 হরমোনের ভূমিকা
থাইরয়েড ফাংশন টেস্টে মূলত তিনটি প্রধান হরমোনের মাত্রা দেখা হয়: থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH), ট্রাইআইওডোথাইরোনিন (T3) এবং থাইরক্সিন (T4)। TSH হরমোনটি মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত হয় এবং এটি থাইরয়েড গ্রন্থিকে T3 ও T4 হরমোন তৈরি করতে উদ্দীপিত করে। যদি TSH এর মাত্রা বেশি থাকে এবং T3 ও T4 এর মাত্রা কম থাকে, তাহলে এটি হাইপোথাইরয়েডিজম নির্দেশ করে, যার অর্থ থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করছে না। এর ফলে ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পারা এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, যদি TSH এর মাত্রা কম থাকে এবং T3 ও T4 এর মাত্রা বেশি থাকে, তাহলে এটি হাইপারথাইরয়েডিজম নির্দেশ করে, যার অর্থ থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করছে। এর ফলে ওজন হ্রাস, অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি এবং গরম সহ্য করতে না পারার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আমার এক পরিচিতের হাইপারথাইরয়েডিজম ছিল, আর তার ওজন দ্রুত কমে যাচ্ছিল।
থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ ও চিকিৎসা
থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা শরীরে বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে, যা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। হাইপোথাইরয়েডিজমের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, শুষ্ক ত্বক, চুল পড়া, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা এবং বিষণ্ণতা। হাইপারথাইরয়েডিজমের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ওজন হ্রাস, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, ঘাম হওয়া, উদ্বেগ, হাত কাঁপা এবং অনিদ্রা। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট করানো উচিত। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার সঠিক রোগ নির্ণয় করতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী ওষুধ বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারেন। থাইরয়েডের সমস্যাগুলোকে শুরুতে ধরলে এবং ঠিকমতো চিকিৎসা করলে একজন ব্যক্তি প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। আমি দেখেছি, সঠিক ঔষধ ও নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে থাইরয়েড রোগীদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে।
রিপোর্টে অস্বাভাবিক ফলাফল দেখলে কী করবেন?
ল্যাব রিপোর্ট হাতে আসার পর সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো যখন আপনি দেখেন কিছু ফলাফল স্বাভাবিক পরিসরের বাইরে। আমার নিজেরও এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেখানে প্রথমবার রিপোর্ট দেখে আমি প্রায় দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এই মুহূর্তটি আসলে আতঙ্কিত হওয়ার নয়, বরং ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করার। মনে রাখবেন, একটি অস্বাভাবিক ফলাফল মানেই গুরুতর কোনো রোগ নয়, এটি অনেক কারণে হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনি কীভাবে এই পরিস্থিতিটিকে দেখেন এবং পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেন। আপনার মানসিক শান্তি বজায় রাখা এই সময়ে অত্যন্ত জরুরি, কারণ অযথা দুশ্চিন্তা আপনার শারীরিক অবস্থাকে আরও খারাপ করতে পারে।
অযথা আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন
একটি ল্যাব রিপোর্টে অস্বাভাবিক ফলাফল দেখলেই অনেকে গুগল করে বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে জানতে শুরু করেন, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল বোঝাবুঝি এবং অতিরিক্ত উদ্বেগের জন্ম দেয়। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এটি মোটেও ঠিক নয়। আপনার রিপোর্টে উল্লেখিত রেফারেন্স রেঞ্জ (normal range) এর বাইরে ফলাফল থাকলেও তার মানে এই নয় যে আপনি নিশ্চিতভাবে কোনো গুরুতর রোগে আক্রান্ত। অনেক সময় সাময়িক অসুস্থতা, ওষুধের প্রভাব, খাদ্যাভ্যাস বা এমনকি পরীক্ষার আগের দিন রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণেও কিছু মান সামান্য এদিক-ওদিক হতে পারে। তাই, আপনার প্রাথমিক কাজ হলো যত দ্রুত সম্ভব আপনার চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা। তিনি আপনার মেডিকেল হিস্টরি, শারীরিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য লক্ষণগুলো মিলিয়ে দেখে সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শই আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে এবং অনর্থক দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচাবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন
যদি আপনার রিপোর্টে কোনো অস্বাভাবিক ফলাফল আসে, তাহলে আপনার চিকিৎসক পরবর্তী কিছু পরীক্ষার (যেমন – নির্দিষ্ট কোনো হরমোন পরীক্ষা, ইমেজিং টেস্ট যেমন আল্ট্রাসাউন্ড বা এক্স-রে) পরামর্শ দিতে পারেন। এছাড়াও, তিনি আপনার জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনার কথাও বলতে পারেন, যেমন খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ কমানো এবং ধূমপান বা মদ্যপান ত্যাগ করা। আমার এক বন্ধু তার কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি আসার পর ডাক্তারের পরামর্শে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনেছিল এবং নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করেছিল, যার ফলস্বরূপ তার পরবর্তী রিপোর্টে কোলেস্টেরল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। মনে রাখবেন, রোগ নির্ণয় যতটা জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি হলো সঠিক চিকিৎসা এবং সুস্থ জীবনযাপন। আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন এবং নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন থাকুন।
| পরীক্ষার নাম | সাধারণ কাজ | অস্বাভাবিক ফলাফলের সম্ভাব্য কারণ |
|---|---|---|
| CBC (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) | রক্তের কোষের পরিমাণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে | সংক্রমণ, রক্তাল্পতা, প্রদাহ |
| LFT (লিভার ফাংশন টেস্ট) | লিভারের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে | লিভারের প্রদাহ, হেপাটাইটিস, ফ্যাটি লিভার, জন্ডিস |
| KFT (কিডনি ফাংশন টেস্ট) | কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে | কিডনি রোগ, ডিহাইড্রেশন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস |
| FBS / PPBS (ব্লাড সুগার) | রক্তে শর্করার মাত্রা পরিমাপ করে | ডায়াবেটিস, প্রি-ডায়াবেটিস |
| HbA1c (গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন) | গত ২-৩ মাসের গড় রক্তে শর্করা পরিমাপ করে | ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ বা নির্ণয় |
| কোলেস্টেরল প্রোফাইল | ভালো ও খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা পরিমাপ করে | হৃদরোগের ঝুঁকি, জীবনযাত্রার ভুলভ্রান্তি |
| Urine R/M/E (প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষা) | প্রস্রাবের ভৌত, রাসায়নিক ও মাইক্রোস্কোপিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে | মূত্রনালীর সংক্রমণ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস |
| TFT (থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট) | থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা মূল্যায়ন করে | হাইপোথাইরয়েডিজম, হাইপারথাইরয়েডিজম |
글을মাচি며
বন্ধুরা, আমার আজকের এই লম্বা পোস্টটি হয়তো আপনাদের অনেকেরই ল্যাব রিপোর্ট ভীতি দূর করতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে বলে আমার বিশ্বাস। আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর একজন ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞানটুকু আপনাদের সাথে সহজভাবে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। মনে রাখবেন, আমাদের শরীর আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ, আর এর যত্ন নেওয়া আমাদেরই দায়িত্ব। ল্যাব রিপোর্ট দেখে ভয় না পেয়ে বরং সঠিক তথ্য জেনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, আর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করুন!
알아두면 쓸모 있는 정보
১. আপনার হাতে আসা যেকোনো ল্যাব রিপোর্ট অবশ্যই রেফারেন্স রেঞ্জ (Normal Range) এর সাথে মিলিয়ে দেখুন। রেঞ্জের বাইরে গেলেই আতঙ্কিত হবেন না, কারণ ছোটখাটো কারণেও মান এদিক-ওদিক হতে পারে।
২. রিপোর্টের কোনো অংশ বুঝতে অসুবিধা হলে বা কোনো অস্বাভাবিক ফলাফল দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া অর্ধেক জ্ঞান অনেক সময় ভুল পথে চালিত করে।
৩. নির্দিষ্ট সময় পর পর আপনার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো করিয়ে নিন, বিশেষ করে যদি আপনার পরিবারে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের মতো কোনো দীর্ঘমেয়াদী রোগের ইতিহাস থাকে। নিয়মিত চেকআপ আপনাকে অনেক বড় বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে।
৪. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়াম আপনার শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। আমি দেখেছি, জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন এনেই অনেকে নিজেদের শারীরিক অবস্থা অনেকটাই উন্নত করতে পেরেছেন।
৫. যেকোনো মেডিকেল পরীক্ষার আগে আপনার চিকিৎসককে আপনার বর্তমান ঔষধপত্র, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। এটি সঠিক ফলাফল পেতে এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করবে।
중요 사항 정리
মনে রাখবেন, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি ল্যাব রিপোর্টগুলো আপনার শরীরের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। এই রিপোর্টগুলো হাতে পেলে শান্ত থাকুন, মূল অংশগুলো চিনতে শিখুন এবং অযথা আতঙ্কিত না হয়ে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তিনিই আপনার ব্যক্তিগত অবস্থা এবং মেডিকেল হিস্টরি অনুযায়ী সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরামর্শ দেবেন। আপনার সুস্থ জীবনই আমাদের কাম্য, তাই নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হন এবং সচেতন থাকুন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ) 📖
প্র: ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি ল্যাব রিপোর্ট হাতে পেলে সবার আগে আমার কী দেখা উচিত?
উ: সত্যি বলতে কি, ল্যাব রিপোর্ট হাতে এলে প্রথম যে জিনিসটা আমরা খুঁজি তা হলো ‘নরমাল’ বা ‘অ্যাবনরমাল’ লেখাটা! আমার নিজের অভিজ্ঞতাও ঠিক এমনই ছিল। যখনই কোনো রিপোর্ট পাই, সবার আগে চোখ যায় রেঞ্জের দিকে। রিপোর্ট অনুযায়ী আপনার যে প্যারামিটারগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে, সেগুলোর পাশে দুটো মান দেখতে পাবেন – একটি হলো আপনার পরীক্ষার ফলাফল, আর অন্যটি হলো রেফারেন্স রেঞ্জ বা স্বাভাবিক মাত্রা। যদি আপনার ফলাফল এই রেফারেন্স রেঞ্জের মধ্যে থাকে, তাহলে সাধারণত চিন্তার কিছু নেই। আর যদি রেঞ্জের বাইরে থাকে, তাহলে সেখানে হয়তো ‘H’ (হাই) বা ‘L’ (লো) লেখা থাকতে পারে, যা বোঝায় আপনার ফলাফল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম। তবে একটা কথা বলি, শুধু ‘হাই’ বা ‘লো’ দেখেই কিন্তু ঘাবড়ে যাবেন না!
এর পেছনের কারণটা কিন্তু অনেক কিছুই হতে পারে, যা কেবল একজন চিকিৎসকই সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারবেন। যেমন ধরুন, হিমোগ্লোবিন রিপোর্ট। আমার একবার রিপোর্ট হাই এসেছিল, আর আমি তো ভয়ে অস্থির!
পরে ডাক্তার বললেন, এটা সাময়িক, জলের অভাব বা অন্য কোনো ছোট কারণেও হতে পারে। তাই প্রাথমিক ধারণা পেতে রেঞ্জ দেখুন, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।
প্র: রিপোর্টে কোনো মান অস্বাভাবিক দেখালে সাথে সাথেই কি চিন্তিত হওয়া উচিত?
উ: এই প্রশ্নটা প্রায়ই আমার কাছে আসে, আর এর সহজ উত্তর হলো – না, সাথে সাথেই এতটা চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই। আমি নিজে যখন প্রথমবার এমনটা দেখেছিলাম, আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল!
কিন্তু পরে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছ থেকে জেনেছি যে, রিপোর্টে কোনো মান অস্বাভাবিক দেখালেই যে গুরুতর কিছু হয়েছে, তা কিন্তু সব সময় ঠিক নয়। যেমন, সাধারণ ফ্লু বা সর্দি-কাশির সময়ও কিছু রক্ত পরীক্ষার ফলাফল সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে। আবার, আপনি পরীক্ষার আগে কী খেয়েছেন, কতটা ঘুমিয়েছেন, এমনকি আপনার মানসিক চাপও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু কিছু অস্বাভাবিক ফলাফল স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়ার অংশও হতে পারে, যা নির্দিষ্ট কোনো রোগের ইঙ্গিত নাও দিতে পারে। একবার আমার বন্ধুর রক্তে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা সামান্য বেশি এসেছিল, সে তো কেঁদেকেটে অস্থির!
পরে জানা গেল, ওর শরীরে একটা ছোটখাটো ইনফেকশন ছিল, যার জন্য শরীর নিজেই লড়ছিল। তাই অস্বাভাবিক রিপোর্ট দেখলে ভয় না পেয়ে, ঠাণ্ডা মাথায় ডাক্তারের পরামর্শ নিন। তিনিই আপনার সম্পূর্ণ শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে রিপোর্টটি ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
প্র: ল্যাব রিপোর্টগুলি সহজে বোঝার জন্য কিছু কার্যকর টিপস দিতে পারবেন কি?
উ: অবশ্যই! আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট বন্ধুদের সাথে কথা বলে কিছু অসাধারণ টিপস আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি, যা আপনার ল্যাব রিপোর্ট বোঝা অনেক সহজ করে দেবে। প্রথমত, রিপোর্টের নামগুলো ভালোভাবে দেখুন। যেমন, CBC (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট), LFT (লিভার ফাংশন টেস্ট) বা KFT (কিডনি ফাংশন টেস্ট) – প্রতিটি রিপোর্টেরই একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি প্যারামিটারের পাশে থাকা স্বাভাবিক রেঞ্জটা খেয়াল করুন। রেফারেন্স রেঞ্জগুলো ল্যাবের উপর ভিত্তি করে সামান্য ভিন্ন হতে পারে, তাই আপনার রিপোর্টে দেওয়া রেঞ্জটাই দেখুন। তৃতীয়ত, কোনো টার্ম বা শব্দ বুঝতে না পারলে ভয় পাবেন না। এখন ইন্টারনেটে সহজেই এসবের বাংলা ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়। তবে, গুগল করে নিজে নিজে চিকিৎসা শুরু করবেন না যেন!
আমার পরামর্শ হলো, রিপোর্ট নিয়ে সবসময় আপনার ডাক্তারের কাছে যান। তিনি আপনাকে প্রতিটি প্যারামিটার কী বোঝায়, অস্বাভাবিক ফলাফল কেন এসেছে এবং এরপর আপনার কী করা উচিত, তা বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে দেবেন। দরকার হলে, একটা নোটবুক নিয়ে যান এবং প্রশ্নগুলো টুকে নিন যাতে কিছু ভুলে না যান। মনে রাখবেন, আপনার শরীর আপনার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, তাই এর যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব আপনারই!






